* You are viewing the archive for the ‘মনোবিজ্ঞান’ Category

নীরব ঘাতক : ওথেলো সিনড্রোম

ডা: মোহিত কামাল

রাহি ও তুহিনের বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর। এরই মধ্যে অমূলক সন্দেহ যেন চেপে ধরেছে রাহিকে। সন্দেহের বশবর্তী হয়ে প্রায়ই রেগে থাকে রাহি। কথাবার্তায় বিরক্তির ছাপ। দিন দিন তুহিনকে নিয়ে তার সন্দেহের মাত্রা বেড়েই চলেছে। অদৃশ্য আঁধার যেন হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসছে তুহিনের জীবনে। বর্তমানে শুধু সন্দেহের কারণেই ভেঙে যাচ্ছে হাজারো সংসার। আর অযাচিত সন্দেহের এই রোগটির নাম ওথেলো সিনড্রোম। রাহি প্যাথলজিক্যাল জেলাসিতে আক্রান্ত। এর আর এক নাম ওথেলো সিনড্রোম বা মনের সন্দেহ। এমন রোগে আক্রান্ত হলে দাম্পত্য সম্পর্ক ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। বিষময় হয়ে ওঠে পারিবারিক জীবন। রাহির সন্দেহ ঘনীভূত বিশ্বাসে পরিণত হলেও এর পেছনে যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই। রাহির কল্পিত সন্দেহ নিছক হলেও সেটিকে বাস্তবে পরিণত করতে উদ্ধত থাকে সারাক্ষণ। তার কল্পনার বিষয়বস্তুটিকে বাস্তবে রূপ দিতে সন্দেহের কারণে অহরহ ভেঙে যাচ্ছে সাজানো সংসার।
এক জরিপে দেখা গেছে, ওথেলো সিনড্রোম রোগে পুরুষেরা মহিলাদের তুলনায় বেশি ভুগে থাকে। মহিলা ও পুরুষের আক্রান্ত হওয়ার আনুপাতিক হার ১:৩.৭৬।গবেষণায় দেখা গেছে,প্যাথলজিক্যাল জেলাসি কয়েকটি প্রাথমিক রোগের সাথে সংযুক্ত থাকতে পারে।। এ ধরনের রোগীদের শতকরা ১৭-৪৪ ভাগ প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়া, ৩-১৬ ভাগ পিরেসিভ ডিসঅর্ডার, ৩৮-৫৭ ভাগ নিউরোসিস এবং পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার, ৫-৭ ভাগ অ্যালকোহলিজম, ৬-২০ ভাগের ক্ষেত্রে অর্গানিক ডিসঅর্ডার জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্যাথলজিক্যাল জেলাসির কারণে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। ব্রিটেনে ব্রডমুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণা রিপোর্টে ড. মোয়াট দেখিয়েছেন, এদের মধ্যে শতকরা ১২ ভাগ মহিলা এবং ১৫ ভাগ পুরুষ প্যাথলজিক্যাল জেলাসিতে আক্রান্ত ছিল। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, জেলাসি রোগী কর্তৃক শারীরিক জখমের মাত্রাও উল্লেখযোগ্য। এমনও দেখা গেছে, ক্রমাগত তীব্র সন্দেহের জ্বালা সইতে না পেরে অনেক নিরপরাধ সঙ্গী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
ওথেলো সিনড্রোম রোগে কোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হলে কৌশলে মূল্যায়ন করতে হবে। কতটুকু অমূলক বিশ্বাস রোগী ধারণ করে, কী পরিমাণ ক্রোধ বা রাগ রোগী বহন করছে ইত্যাদি। রোগীর ভেতর প্রতিশোধপরায়ণ মনোবৃত্তি থাকলে বিশেষভাবে সতর্ক হতে হবে।
রোগী তার সঙ্গীকে বিপর্যস্ত করে তোলে কি না তা যাচাই করে দেখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সঙ্গীকে কৌশল এবং ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।
সাধারণত এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি মনে করে না, সে রোগে আক্রান্ত। তাই সে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে চায় না। এ ক্ষেত্রে প্যাথলজিক্যাল বা ওথেলো সিনড্রোম রোগের রোগীদের চিকিৎসা করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ রোগী মনেই করে না যে, তার কোনো রোগ হয়েছে। ফলে চিকিৎসার যেকোনো উদ্যোগই তার কাছে অনধিকার চর্চা ও অন্যায় আচরণ বলে মনে হয়।
এ ক্ষেত্রে যদি স্ত্রী অর্থাৎ মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে মেয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে মেয়েকে বুঝিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি স্বামীর প্রধান কাজ হবে স্ত্রীকে এ রোগ সম্পর্কে বোঝানো। বিফল হলে ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে তাকে চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। যদি রোগটি প্রকৃতই অমূলক বিশ্বাসের ওপর গড়ে ওঠে তবে অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। যাদের আত্মবিশ্বাস কম কিংবা ব্যক্তিত্বের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে ডিলুশনাল ডিসঅর্ডার বা প্যাথলজিক্যাল জেলাসিটি ওভার ভেলুড আইডিয়ার সাথে সম্পর্কিত কি না তা যাচাই করে দেখতে হবে।
ওথেলো সিনড্রোম রোগীরা নিজের সন্দেহের কথাগুলো অন্যের কাছে বলে পরামর্শ চায়। কিন্তু যাকে তিনি বলছেন, তার জন্য তিনি কতটুকু ইতিবাচক হবেন তা ভাবেন না। ফলে যিনি শুনছেন, তিনি তার কথা বিশ্বাস করে ভ্রান্ত পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আর রোগীও সেই পরামর্শ গ্রহণ করে তার সঙ্গীর সাথে নেতিবাচক আচরণ করে থাকে। এ ক্ষেত্রে বন্ধুবান্ধব, পরিবারসহ সবাইকে গঠনমূলক পরামর্শ দিতে হবে। কারণ একটি ভুল পরামর্শই ভেঙে দিতে পারে রোগীর সাজানো সংসার।
এই রোগে আক্রান্ত পরিবারগুলোর রোগীর সন্দেহের মাত্রাটা এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, তা প্রমাণ করার জন্য রোগী মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত করে থাকে। এতে সঙ্গীর নানা ধরনের সমস্যা হয়। এ ক্ষেত্রে রোগীর পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে। কোনো অভিভাবক যদি বুঝতে পারেন, এটা এক ধরনের রোগ তবে এ ধরনের সমস্যা কিছুটা হলেও লাঘব হয়। মূলত মামলাটা হয়েই থাকে ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে। মা-বাবা বুঝতে পারেন না, তার সন্তান অসুস্থ।
মামলা হলে আইনজীবী যদি বুঝতে পারেন, রোগী অসুস্থ বা স্বামী যদি দাবি করে যে তার স্ত্রী মানসিকভাবে অসুস্থ, তবে আইনজীবীর প্রথম কাজ হবে তার সত্যতা যাচাই করা। এ ক্ষেত্রে আদালতের উচিত হবে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে তার সত্যতা যাচাই করে রিপোর্ট পেশ করা। এ ক্ষেত্রে স্বামী যেটা করতে পারেন সেটা হলো, কেন তার স্ত্রী মানসিক রোগী; এর কারণগুলো আদালতে উপস্থাপন করা।
এ ক্ষেত্রে কারো যদি সন্তান থাকে, তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। মা-বাবা অসুস্থ হলে শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য যে মানসিক পরিবেশ দরকার হয়, এ ক্ষেত্রে তার অভাব দেখা দেয়। এতে শিশুটি মানসিকভাবে আঘাত পায়। যখন সন্তান অনবরত দেখতে থাকে তার বাবা-মায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব, ঝগড়া, এমনকি শারীরিকভাবে আঘাতের ঘটনাও ঘটছে তখন বাড়ন্ত শিশুটির মানসিক উন্নতি বাধাগ্রস্ত হয়। পরিণতিতে সে ড্রাগ ও ক্রাইমে জড়িয়ে পড়তে পারে। অথবা নিজেই মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে যেতে পারে। সন্তানের সুস্থ বিকাশ ও মননশীলতার জন্য সামাজিক বন্ধন, মমতা ও ভালোবাসা জরুরি।
লেখক : বিশেষজ্ঞ মনোরোগ চিকিৎসক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা। ফোন : ০১৭১১ ৮৩২৯৫৫

 

[উৎসঃ নয়াদিগন্ত, ০৩/০৬/২০১২]